Labels

Showing posts with label এই তো সেদিন. Show all posts
Showing posts with label এই তো সেদিন. Show all posts

Friday, November 10, 2023

জগাদার জানলা

 
 এই তো সেদিন#২
 
 
চোখটা একটু লেগে গেছিলো। জগাদার আর দোষ কি?  সকাল থেকে একের পর এক ঝক্কি সামলে খাওয়া দাওয়ার পর দুপুর আড়াইটে নাগাদ খাটে একটু লম্বা হলে যা হয় আর কি !

ওয়ার্ক ফ্রম হোমে ঠিক টেম্পো নেই জগাদার। তাতে কি ? কাজ কি আর একটা ? সকালে উঠে প্রথমে কোন দেশে কত লোক ইনফেক্টেড, কত মানুষ মৃত , কোথায় কত মাস্ক লাগবে, কি কি ভাবে আহাম্মক ভাইরাসটা ছড়াতে পারে , কার্ভ ফ্ল্যাটেন করতে আর কতটা পথ বাকি , তার ওপর ডাও জোন্স কোথায় , ইকনমি কোন দিকে , কত মানুষ বেকার , ঠিক কোন স্টিমুলাসে সব কিছু আবার নাচন কোদনে ফিরে আসবে এসব এনালিসিস   করা সহজ কথা ? তার ওপর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থেকে লাটভিয়ার প্রাইম মিনিস্টার , বুখারেস্টের মেয়র থেকে পূর্ব মেদিনীপুরের ডি এম  কে কি ভুল করলেন, তাদের ঠিক কি স্ট্রাটেজি নেওয়া উচিত ছিল তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে হোয়াটসআপ-এর ঠেক গুলোতে সবাইকে আপডেট করে তারপর লাঞ্চ খাওয়ার ফুরসৎ। লুচি, ছোলার ডাল, কষা মাংসের সাথে CNN আর BBC. এর পরে তো একটু লম্বা হতেই হয়।

শুয়ে পা নাচাতে নাচাতে কত তাড়াতাড়ি একটা ভ্যাকসিন মার্কেটে আসবে আর অনলাইন গ্রোসারিতে কি কি অর্ডার করতে হবে ভাবতে ভাবতেই ব্যাপারটা হল।  জাস্ট তন্দ্রা মতো।  তন্দ্রা হাত ধরে জগাদাকে নিয়ে গেল আরও গভীরে ।  প্রথমে কোন এক সমুদ্রের তীরে। বীচ ভর্তি অনেক মানুষ ।  মনোরম চারপাশ।  আর জগাদা হেঁটে চলেছে একা একা, জলে পা ভিজিয়ে। হঠাৎ ঢেউয়ের ভেতর থেকে কে যেন  একজন ছুটে আসছে জগাদার দিকে।  কাছাকাছি আসতেই  একটু চেনা চেনা লাগল মুখটা। কিন্তু চেনা মুশকিল কারন লোকটার সারা মুখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। গুন্ডা মতো একটা লোক জগাদার পেছন থেকে এসে দুম দুম করে তিনটে গুলি করল আগের লোকটাকে।  ব্যাস সব শেষ।  বীচে অন্য সবাই দেখেও কিছু দেখল না। জগাদাও কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে লম্বা লম্বা পা ফেলে সমুদ্র পেড়িয়ে এক পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালাতে শুরু করল ।  মুশকো মতো একটা লোক প্যাসেঞ্জার সিটে।  সবুজ পাইনের বন সরে সরে যাচ্ছে ডাইনে বাঁয়ে।  গুলাম আলী সঙ্গ দিচ্ছেন গাড়ির সাউন্ড সিস্টেমে। হঠাৎ দূরে রাস্তার ওপর কি যেন একটা দেখা যাচ্ছে । মুশকো লোকটা জগাদাকে চোখের ইশারা করতেই জগাদা বুঝে গেল রাস্তায় মাইন পাতা আছে।  গাড়ি ঘোরাতেই সে গাড়ি  হেলিকপ্টার হয়ে আকাশে।  উড়ে যেতে যেতে পাশের লোকটাকে জগাদা জিজ্ঞেস করল “ ভাই আপনাকে কোথায় দেখেছি বলুন তো ? “ . লোকটা মুচকি হেসে যেই বলেছে প্রাইমেও আছি নেটফ্লিক্সেও আছি অমনি এক ঝাঁক মৌমাছি হেলিকপ্টারের জানলায় বসে ভোঁ ভোঁ করে এমন হাসাহাসি শুরু করল যে জগাদা টাল  সামলাতে না পেরে ধপাস করে ক্র্যাশ, একদম বিছানার ওপরে।

ধড়মড় করে উঠে বসল জগাদা।  বাইরের আলো কি একটু কম ? ভোর হল না কি সন্ধ্যে ? গলা শুকিয়ে এসেছে ।  উঠে এক ঢোক জল খেয়ে মনে করার চেষ্টা করল “কোথায় আছি আমি “।  মনে পড়ল না।

চোখে পড়ল একটা জানলা, বেডরুমের।  জানলার সামনে এসে দাঁড়াল জগাদা । জানলা দিয়ে রাস্তা দেখা যায়।  প্রতিবেশীদের বাড়ি, পরপর। সামনের বাড়ির দরজায় একজন মধ্যবয়সী মহিলা গ্রোসারি ডেলিভারি দিয়ে গেলেন । বাইরে একটা ঝড়ো হাওয়া।  রাস্তায় আর কেউ নেই। কটা শুকনো পাতা হুড়মুড় করে দলবেঁধে রাস্তা পার হল হাওয়ার পিঠে চরে । পাতাগুলোর সঙ্গে একটা ডিসপোজেবল মাস্কও ।  একটু দূরে একটা বড় গাছ।   গাছটা মাথা নাড়ছে জোরে জোরে। হঠাৎ চোখে পড়ল জগাদার বাড়ির পাঁচিলের ওপরেই বসে একটা  পাখি। নীল আর কালোর মিশেল। পাখিটা কিরকম কনফিউসড। নিজের বাসা খুঁজে পাচ্ছে না ? নাকি ঝড়ে উড়ে গেছে ওর বাসা। খুব চেনা পাখিটা। জগাদা ভালো করে অনেকক্ষন দেখেও পাখিটার নামটা মনে করতে পারল না।  জানলা দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে শুধু তাকিয়েই রইল বাইরের দিকে ।  বাইরেটা একদম অচেনা।  

Tuesday, November 7, 2023

সাইকেলওয়ালা

 


এই তো সেদিন # ১


মাঠ ঠিক বলা যায় না , রাস্তার ধারে এক চিলতে ফাঁকা জমি ।  এবড়ো খেবড়ো , অসমান, নিচু।  বৃষ্টি হলেই জল জমে প্রায় ডোবার আকার নেয়।  সেখানেই বাঁশের বেড়া বেঁধে কিছুটা জায়গা ঘেরা হয়েছে। তার ভেতরে একটা ছেলে সাইকেল চালাচ্ছে । অনেকে ভিড় করে দেখছে।  স্কুল থেকে ফেরার পথে আমরাও দাঁড়িয়ে পড়লাম।  আমরা মানে আমি আর মানস।  দেখছি ছেলেটা শুধু গোল হয়ে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে, চকের গুঁড়ো দিয়ে করা একটা বৃত্তের মধ্যে ।

“সাতদিন টানা চালাবে “ , মানস  বলল।  
“সাত দিন ? তুই বললেই হল ? “ , আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না ।  
“চ্যালেঞ্জ ? “, মানস সব ব্যাপারেই আমার থেকে অনেক বেশী জানে, তাই চুপ করে গেলাম ।

একটু একটু করে ভিড় বাড়ছে ।  বাচ্চা থেকে বুড়ো অনেক লোক।  মাঠের কোণে একটা প্যান্ডেল মতো খাটানোর কাজ চলছে ।  সেখানে পাড়ার কয়েকজন দাদা  বেঞ্চ পেতে বসেছে।  মাইকে “কি গাব আমি কি শুনাব আজি আনন্দধামে “। মানস বলল চল বসি। ঘাসের ওপর আমরা বসে পড়লাম স্কুলের ব্যাগ পাশে রেখে। ছেলেটা চালিয়েই যাচ্ছে।  একটা কালো রঙের প্যান্ট আর নীল  হাফ শার্ট। ঘুরতে ঘুরতে যখন আমাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছে তখন দেখলাম টস টস করে ঘাম ঝরছে ওর কপাল আর গাল দিয়ে।  “জোরে, আরও জোরে” বলে চেঁচাল কারা।  আরও উৎসাহে চালাতে লাগল ছেলেটা যেন।  

“আমসত্ব খাবি ? “ , মানস ওর ব্যাগ থেকে বের করল ।  নিলাম।  কিরকম কালো কালো দেখতে আর টকটক স্বাদ ।  “আমার পিসি গোয়া থেকে নিয়ে এসেছে “, বলল মানস। এবার আমাদের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমার চোখে চোখ পড়তে হাত নাড়াল ছেলেটা আমাদের দিকে।  আমরাও হাত নাড়লাম।  ক্লাবের খোকনদা  হঠাৎ ছুটে গেল ওই ঘেরা জায়গাটার মধ্যে। হাতে একটা জলের বোতল।  মানস বলল দেখ , এবার চালাতে চালাতে জল খাবে।  আমরা উঠে পড়লাম। খোকনদা জলের বোতল হাতে পাশে পাশে ছুটছে আর ছেলেটা সাইকেল চালাতে চালাতে এক হাতে বোতল নিয়ে জল খাচ্ছে।  আমরাও গোল হয়ে বাইরে দিয়ে ছুটলাম দেখার জন্য।  কিছুটা জল খেয়ে বোতলের বাকি জলটা নিজের মাথায় ঢেলে দিল ছেলেটা । ওর মুখ গলা জামা ভিজে গেল, দেখে খুব মজা লাগল আমাদের ।

“দেখলি  , যাই করুক থামবে না কখনও।  সাইকেল চালিয়েই যাবে “  
“তুই কি আগে দেখেছিস ? “ , মানসকে না জিজ্ঞেস করে পারলাম না
“নৈহাটিতে মাসীর বাড়ি গেছিলাম , ওখানে হয়েছিল “
“এই ছেলেটাই  ?”
“না না , অন্য একজন “

আমি আগে এরকম কিছু দেখিনি। কেউ একটা বলল ছেলেটা তারকেশ্বরে থাকে।  ওর নাম রুনু। আমাদের থেকে একটু বড়ই হবে। চোখ সরাচ্ছি না আমরা রুনুর ওপর থেকে।  দেখতে দেখতে আমারই মনে হচ্ছে মাথা ঘুরবে এবার। ও কিন্তু পাক মেরেই যাচ্ছে। মাইকের রবীন্দ্রসংগীত শেষ হয়ে তখন “চলতে চলতে মেরে ইয়ে গীত “। হঠাৎ খেয়াল হল বাড়িতে গিয়ে বকুনি খেতে হবে “স্কুল ছুটির পর আর বাড়ি ঢুকতে ইচ্ছে করে না “-র জন্য ।

বাড়ি যাচ্ছি শুনে মানস বলল “রাত্রে আসবি তো? “
“রাত্রে ? কেন ? “
“ আরে সাড়ে নটার সময় ভাত খাবে , দেখবি না ?”
“সাইকেল চালাতে চালাতে ? “
“না খেয়ে থাকবে না কি ! “

‘তাহলে তো আসতেই হবে’ ভাবতে ভাবতে বাড়ির দিকে হাঁটা  দিলাম।  

দেরি করার জন্য একটু বকুনি খেলাম। কিন্তু সেসব সেদিন মাথায় ঢোকেনি।  পড়তে বসতে ইচ্ছেই  করছিল না । তবু বসতে হল।  হোমওয়ার্ক আছে , টেস্ট আছে পরদিন।  কিন্তু যাই করি মন সেই মাঠেই পরে আছে । অন্ধকার হয়ে গেল , রাত হয়ে যাচ্ছে । ও কি এখনও সাইকেল চালাচ্ছে ? ওর পা ব্যাথা করছে না ? আচ্ছা বাথরুম যেতে হলে কি করবে ? ঘুম পেলে কি হবে ?

খুব ইচ্ছে করলেও রাত সাড়ে নটার সময় বাড়ি থেকে বেরোব বলার সাহস হল না বাবা মাকে।  রাত্রে ঘুম ভেঙে গেল কয়েকবার।  ঘুম ভেঙে প্রত্যেকবারই মনে হল সবাই ঘুমোচ্ছে আর রুনু  একা একা ঘুরে যাচ্ছে সাইকেল নিয়ে ! সত্যি ?

সকালে উঠে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে স্কুল যাওয়ার পথে চলে গেলাম ওই মাঠে।   তখনও রুনু সাইকেল চালাচ্ছে।  সেই কালো প্যান্ট আর নীল জামা।  কাছে গিয়ে একটু মুখের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম , ক্লান্ত মনে হল, কিন্তু মুখে হাসি।  স্কুল গেলাম।

এভাবেই কাটল কয়েকদিন । স্কুলে যাওয়ার পথে আর ফেরার সময় ওই মাঠে দাঁড়িয়ে থাকি। স্কুলের আরও বন্ধুরাও আসতে শুরু করল। বাংলা ক্লাসে হোমওয়ার্কে হাতের লেখা খারাপ হওয়ার জন্য বকুনি খাই একদিন তো ক্লাস টেস্টে সহজ অঙ্কের উত্তর অন্য বন্ধুদের সাথে মেলে না আরেকদিন। মাথার মধ্যে সারাক্ষন শুধু গোল হয়ে ঘুরে যাচ্ছে সাইকেলে রুনুদা ।  ও তখন আমাদের সবার রুনুদা হয়ে গেছে।

রুনুদার “সাতদিনব্যাপী লাগাতার সাইকেল চালনা” আমাদের পাড়ার প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠল. সারাক্ষন ভিড় মাঠে। ফুচকা , ঝালমুড়ি বিক্রি হচ্ছে একদিকে। কোয়ালিটি আইসক্রিমের গাড়ি আরেকদিকে। লক্ষ্য  করলাম রুনুদার  জামায় সেফটিপিন দিয়ে টাকার নোট লাগানো। এক টাকা, দুটাকা, পাঁচ টাকার নোট।  যে যা পারছে দিচ্ছে আর সেই টাকা ক্লাবের ছেলেরা ওর শার্টে সেফটিপিন দিয়ে আটকে দিচ্ছে। “যদি সাত দিন টানা চালাতে পারে ওই টাকাগুলো সব ওর “ , মানস কোত্থেকে খবর নিয়ে এসে বলল.

ছয় দিন কেটে গেছে। রাত্রে খেতে বসে বাবা জিজ্ঞেস করল “যাবি  নাকি দেখতে তোর সাইকেলওয়ালাকে ? আজই তো শেষ রাত”. ততদিনে রুনুদাকে  বাড়িতেও সবাই চেনে। যাব না মানে ? রাত প্রায় দশটা । বেশ ভিড়।  বড় বড় লাইট লাগিয়ে মাঠটা ঝলমল করছে।  রুনুদা একটা সাদা রঙের জামা আর কালো প্যান্ট পরে ।  ক্লাবের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম রুনুদা কখন খাবে। বলল ও আজ খাবে না।  শরীর না কি ভাল নেই।  ফ্লাড লাইটের আলোয় ঝলমলে মাঠটায় অনেক হাসি খুশী মানুষ , উৎসব উৎসব ভাব । আর একদিন চালালেই সাতদিন। রুনুদার  মুখটা দেখার চেষ্টা করলাম কতবার , ঠিক দেখতে পেলাম না। যতবারই দেখতে যাই চলন্ত সাইকেল আর  ফ্লাডলাইট থেকে পড়া তেরছা আলোর মধ্যে পিছলে গিয়ে কিভাবে যেন অন্ধকারে থেকে যায় ওর মুখটা , স্পষ্ট দেখা যায় না । সাইকেল চালাতে চালাতে কিভাবে ভাত খাবে দেখতে পেলাম না বলে একটা আক্ষেপ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম ।  ফেরার সময় রাস্তায় কে একটা বলছে শুনলাম “ ও তো সাইকেল চালিয়েই খায়” .

পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে ওখানে গিয়ে থমকে গেলাম।  কিরকম যেন ভাঙা হাট।  রুনুদাকে দেখতে পেলাম না ।  মানস আমাকে দেখে এগিয়ে এল ।  ওর মুখ থমথমে।

“কি রে ? “
“এ পারবে না আমি সেকেন্ড দিনই বুঝে গেছিলাম  “
“ কি করে ? কি হয়েছে ?“
“মাথা ঘুরে পরে গেছে কাল রাতে।  অজ্ঞান হয়ে গেছিল, হাসপাতালে নিয়ে গেছে “
“কি হবে ? “

মানস জবাব দিল না. হাঁটতে শুরু করল, আমি ওর পিছু পিছু । স্কুল অবধি পুরো রাস্তা আর কোন কথা বলল না মানস।  আমিও না। শুধু রুনুদার জন্য আমাদের বুকের মধ্যে একটা চিনচিনে ব্যাথা রয়েই গেল, নীরবে।   

Readers Loved These Posts